আমের বদলে বরই চাষে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে

আম চাষে লোকসানের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকেরা বরই চাষে ঝুঁকছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বহু বছর ধরে আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। জেলার কৃষি ও অর্থনীতি মূলত আম চাষের উপর নির্ভরশীল ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টি, রোগবালাই, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে অনেক কৃষক আম চাষে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। এর ফলে জেলায় ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে বরই চাষের প্রবণতা। শত শত কৃষক লাভজনক ও তুলনামূলক সহজ চাষের কারণে আমের বদলে বরইকে বিকল্প ফসল হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
বর্তমানে জেলায় চায়না, বল সুন্দরী, বোম্বাই ফুলী, ডায়মন্ড, বাউকুল, থাই, বেবি সুন্দরী ও ভারত সুন্দরীসহ বিভিন্ন জাতের বরই চাষ হচ্ছে। কম পরিচর্যা, স্বল্প খরচ এবং দ্রুত ফলনের কারণে বরই চাষ কৃষকদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে। অনেক কৃষক আম বাগানের ফাঁকে ফাঁকে বা দীর্ঘদিন পতিত জমিতে বরই চাষ শুরু করেছেন।
বরই বিপণনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে শিবগঞ্জ উপজেলার দাইপুকুরিয়া ইউনিয়নের মির্জাপুর এলাকার বরই হাট। প্রতিদিন দুপুরের পর থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে কৃষকরা ভ্যানে ও পিকআপে ক্যারেটভর্তি বরই নিয়ে হাটে আসেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী আলি আসরাফ জানান, “প্রতিদিন দুপুর ১২টার পর থেকেই কৃষকদের ভিড় বাড়তে থাকে। আড়তদাররা বরই বাছাই করে কিনে নেন। এখান থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বরই পাঠানো হয়। বর্তমানে প্রতি মণ বরই সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”
বরই চাষ করে আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন অনেক কৃষক। শিবগঞ্জ উপজেলার বরই চাষি তারেক রহমান বলেন, “জন্মের পর থেকেই আমি আম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘদিন আমই ছিল আমাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় আম চাষে ধারাবাহিকভাবে লোকসান হচ্ছে। এতে আমরা চরম আর্থিক সংকটে পড়ে যাই।” তিনি আরও বলেন, “বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে গিয়ে প্রথমে অল্প জমিতে বরই চাষ শুরু করি। ফলন ভালো হওয়ায় এবং বাজারে দাম পাওয়ায় এখন অনেকটাই আশাবাদী। বরই চাষে খরচ কম, সময় কম লাগে এবং দ্রুত লাভ পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে আরও জমিতে বরই চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।”
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় প্রায় ৫৬০ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, “আম চাষে লোকসান হওয়ায় অনেক কৃষক বরই চাষের দিকে ঝুঁকছেন। মির্জাপুর হাট দিনে প্রায় ১ কোটি টাকার বরই বিক্রি হয়। বরই একটি লাভজনক ফসল এবং এটি চাষিদের বিকল্প আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠেছে।”
তিনি আরও জানান, আধুনিক চাষপদ্ধতি, প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বরই চাষ ভবিষ্যতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও রপ্তানি উদ্যোগ বাড়ানো হলে বরই চাষ শুধু কৃষকদের ভাগ্য বদলাবে না, বরং আমনির্ভর অর্থনীতির বাইরে গিয়েও চাঁপাইনবাবগঞ্জের জন্য নতুন কৃষি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।



