ঠাকুরগাঁওয়ে স্বর্ণের কলসির লোভে প্রাণ গেল গৃহবধূর!

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার ভাতুড়িয়া এলাকায় উদ্ধার হওয়া এক নারীর অর্ধপোড়া মরদেহের রহস্য মাত্র ২০ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সামশুল হক নামের এক তান্ত্রিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, স্বর্ণের কলসি ও গুপ্তধনের লোভ দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসা ওই ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত অর্থের চাপ এবং প্রতারণা ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় গৃহবধূ নাসিমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। পরে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
মঙ্গলবার (২ জুন) রাত সাড়ে ৮টায় ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন এসব তথ্য জানান।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার (১ জুন) সকাল ৭টার দিকে ভাতুড়িয়া এলাকার একটি নির্জন স্থানে স্থানীয়রা অর্ধদগ্ধ অবস্থায় এক নারীর মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ মরদেহের গলায় দড়ির দাগ, শরীরে পোড়ার চিহ্ন এবং হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করে। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় নিহত নারীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তিনি রানীশংকৈল উপজেলার রাউতনগর গ্রামের স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল্লাহর স্ত্রী নাসিমা।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেনের নির্দেশনায় জেলা পুলিশের একাধিক টিম তদন্তে নামে। তদন্তের এক পর্যায়ে নিহত নাসিমার ১২ বছর বয়সী মেয়ের দেওয়া তথ্য, অর্থ লেনদেনের বিভিন্ন সূত্র এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে তান্ত্রিক সামশুল হকের দিকে।
তদন্তে উঠে আসে, দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণের কলসি, স্বর্ণের পুতুল এবং গুপ্তধন পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নাসিমার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিলেন সামশুল হক। বিভিন্ন সময়ে অলৌকিক শক্তির গল্প শুনিয়ে তিনি নাসিমাকে বিশ্বাস করান যে বিশেষ তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গুপ্তধন উদ্ধার করা সম্ভব।
পুলিশ জানায়, ঘটনার দিনও নাসিমা তার কাছে প্রতিশ্রুত স্বর্ণ এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। এতে বিপাকে পড়ে সামশুল পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে তন্ত্র-মন্ত্রের আচার পালনের কথা বলে সুযোগ বুঝে নাসিমার গলায় দড়ি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।
হত্যার পর ঘটনাটি অন্যদিকে প্রবাহিত করতে এবং আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নাসিমার পরনের বোরখায় আগুন ধরিয়ে দেন অভিযুক্ত। তবে আগুন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই নিভে যাওয়ায় মরদেহের পেছনের অংশ আংশিক দগ্ধ হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ আলামত অক্ষত থাকে, যা তদন্তে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার দিনই সামশুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নাসিমার কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া ৩০ হাজার টাকাও উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, সামশুল হক দীর্ঘদিন ধরে অলৌকিক শক্তি, গুপ্তধন এবং স্বর্ণের কলসির গল্প শুনিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতেন। প্রাথমিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রায় কোনো প্রত্যক্ষ সূত্র ছাড়াই শুরু হওয়া এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য মাত্র ২০ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হওয়াকে পুলিশের বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারকৃত সামশুল হক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্র জড়িত আছে কি না, তা জানতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।



