ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবের আবহে মিশরে উদযাপিত হলো হিজরি নববর্ষ ১৪৪৮

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা এবং উৎসবমুখর পরিবেশে ১৪৪৮ হিজরি নববর্ষকে বরণ করে নিয়েছে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ মিশর। রাজধানী কায়রো থেকে শুরু করে আলেকজান্দ্রিয়া, গিজাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিশেষ দোয়া, ধর্মীয় আলোচনা, কোরআন তিলাওয়াত, সামাজিক মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন হিজরি বছরের সূচনাকে স্বাগত জানান লাখো মুসল্লি। নতুন বছরের শুরুতে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মশুদ্ধি, ইসলামের আদর্শ অনুসরণ এবং মুসলিম উম্মাহর শান্তি-সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রার্থনায় অংশ নেন তারা।
বুধবার (১৭ জুন) সন্ধ্যায় মহররম মাসের চাঁদ দেখার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় মিশরের সর্বোচ্চ ফতোয়া প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান দার আল-ইফতা। চাঁদ দেখার ঘোষণা প্রকাশের পরপরই দেশজুড়ে শুরু হয় হিজরি নববর্ষ উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতা। মসজিদ, ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন আয়োজন করে বিশেষ আলোচনা সভা, ওয়াজ মাহফিল, দোয়া ও কোরআন খতমের কর্মসূচি। নতুন বছরের প্রথম দিনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
রাজধানী কায়রোর ঐতিহাসিক মসজিদগুলোতে সকাল থেকেই মুসল্লিদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। আল-আজহার মসজিদ, আমর ইবনুল আস মসজিদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মসজিদে বিশেষ নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। অনেকেই এ দিনকে আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং নতুনভাবে ধর্মীয় জীবন শুরু করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন।
মিশরে হিজরি নববর্ষ কেবল একটি ধর্মীয় দিবস নয়; এটি দেশটির দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। এ উপলক্ষে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, শিশুদের নতুন পোশাক পরানো, ঘরোয়া দাওয়াত, বিশেষ খাবারের আয়োজন এবং সামাজিক সম্প্রীতির বিভিন্ন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনেক এলাকায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও নববর্ষ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করে থাকে, যা উৎসবের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে সবচেয়ে বড় আয়োজনগুলোর একটি অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ইসলামি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আল-আজহার শরীফে। কায়রোর ঐতিহাসিক আল-আজহার মসজিদে আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে দেশটির শীর্ষস্থানীয় আলেম, ইসলামি চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আল-আজহার শরীফের প্রতিনিধি আবদুল গনি, মিশরের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী ড. ওসামা আল-আজহারি, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি ড. সালামা দাউদ, মিশরের গ্র্যান্ড মুফতি ড. নজির আয়াদ, ইসলামিক রিসার্চ কমপ্লেক্সের মহাসচিব ড. মোহাম্মদ আল-জিন্দি, আল-আজহার ইনস্টিটিউটস সেক্টরের প্রধান ড. আহমেদ আল-শারকাওয়ি, মিশরের আশরাফ সংগঠনের প্রধান শরীফ মাহমুদ শরীফ, সুফি তরিকার সর্বোচ্চ পরিষদের প্রধান ড. আবদুল হাদি আল-কাসাবি, আল-আজহারের সাবেক প্রতিনিধি ড. মোহাম্মদ আবদুর রহমান আল-দুওয়াইনি, সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি ড. শওকি আল্লাম এবং আল-আজহার সুপ্রিম কাউন্সিলের মহাসচিব ড. ইসমাইল আল-হাদ্দাদসহ অসংখ্য বিশিষ্ট আলেম ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, হিজরি নববর্ষ কেবল একটি নতুন বছরের সূচনা নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ত্যাগ, সংগ্রাম এবং আত্মিক উন্নয়নের প্রতীক। তারা বর্তমান বিশ্বে মানবতা, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় ঐক্য, জ্ঞানচর্চা, সহনশীলতা এবং ইসলামের মধ্যপন্থী আদর্শকে আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান।
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে শান্তি, সম্প্রীতি, উগ্রবাদ প্রতিরোধ এবং আন্তধর্মীয় সংলাপ প্রতিষ্ঠায় আল-আজহার শরীফ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ইসলামকে শান্তি, মানবতা ও সহনশীলতার ধর্ম হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আবহ। কোরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাত পরিবেশন, ইসলামি আলোচনা এবং বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, কল্যাণ, সমৃদ্ধি এবং বিশ্ব মানবতার মঙ্গল কামনা করা হয়। গাজাসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং নির্যাতিত মানুষের মুক্তির জন্যও বিশেষ দোয়া করা হয়।
ইসলামের ইতিহাসে হিজরি সনের সূচনা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় ঐতিহাসিক হিজরতের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে এই হিজরতকে ভিত্তি করেই ইসলামি বর্ষপঞ্জি বা হিজরি সনের প্রবর্তন করা হয়। এরপর থেকেই মুসলমানদের ধর্মীয় জীবন, ইবাদত ও গুরুত্বপূর্ণ দিবসসমূহ—যেমন পবিত্র রমজান, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, হজ, আশুরা, লাইলাতুল কদর, শবে বরাতসহ বিভিন্ন ইবাদত ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান—হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নির্ধারিত হয়ে আসছে।
তাই হিজরি নববর্ষ শুধু একটি নতুন বছরের সূচনা নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঈমানি চেতনা, আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, ঐক্য এবং ইসলামের মহান আদর্শকে নতুন করে স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ১৪৪৮ হিজরি নববর্ষকে কেন্দ্র করে মিশরের মুসলমানরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, নৈতিক মূল্যবোধ চর্চা, সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।



