নদী নিয়ে যত কথা

মো. আহনাফ হাসান
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এদেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রা আবর্তিত হয় নদীকে কেন্দ্র করেই। সরকারি তথ্যমতে, বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা ১,০০৮টি। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা এই নদীগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪,১৪০ কিলোমিটার। দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা কোনো না কোনো নদীর অববাহিকা বা ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’র অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া মোট আয়তনের প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশ জুড়ে রয়েছে স্থায়ী নদী ও বিশাল সব জলাশয়। আমাদের দেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টি ভারত থেকে এবং ৩টি মিয়ানমার থেকে এসেছে।
এদেশের প্রতিটি নদীর চলন ও বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও কর্ণফুলী এই নামগুলো যেমন আমাদের অতি পরিচিত, তেমনি কবি-সাহিত্যিকদের লেখাতেও এগুলোর উপস্থিতি চিরন্তন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর মধ্যে মেঘনা দীর্ঘতম, গভীরতম ও প্রশস্ততম। পদ্মার উৎপত্তি তিব্বতের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে; যা ভারতে ‘গঙ্গা’ নামে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে ‘পদ্মা’ নাম ধারণ করেছে। অন্যদিকে, যমুনার ইতিহাস কিছুটা ভিন্ন। ১৭৮৭ সালের এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে তিব্বতের মানস সরোবর থেকে আসা ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে আজকের এই ‘যমুনা’ নদীর সৃষ্টি হয়। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে (দৌলতদিয়া) পদ্মা ও যমুনা মিলিত হয়েছে। পরবর্তীতে এই সম্মিলিত ধারা চাঁদপুরের কাছে মেঘনা নদীর সাথে মিশে ‘মেঘনা’ নামেই বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এভাবে দেশের প্রতিটি নদ-নদী একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলো মূলত জোয়ার-ভাটার নদী হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীও এই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এই নদীর ওপর নির্মিত কাপ্তাই বাঁধ বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। বর্ষাকালে এই নদীগুলো বয়ে আনে কোটি কোটি টন পলিমাটি, যা এদেশের জমিকে উর্বর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া নদীপথ বাংলাদেশের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ মাধ্যম। এ কারণেই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও ভৈরবের মতো বড় বড় বাণিজ্যিক শহর ও বন্দরগুলো নদীর তীর ঘেষেই গড়ে উঠেছে। নদীর সুস্বাদু মাছ যেমন আমাদের আমিষের চাহিদা মেটায়, তেমনি বিদেশে রপ্তানি করে আমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করি।
তবে নদী যেমন আমাদের আশীর্বাদ, তেমনি কখনো কখনো তা ক্ষতির কারণও হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবছর নদী ভাঙনের ফলে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ হেক্টর কৃষিজমি ও বসতভিটা বিলীন হয়ে যায়। ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে বহু মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিতে বাধ্য হন।
নদী রক্ষায় বর্তমানে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক চুক্তি গ্রহণ করা হয়েছে। নদীর গুরুত্ব ও আমাদের দায়িত্ব উপলব্ধি করে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত দেশের প্রতিটি নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ (Living Entity) হিসেবে ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ মানুষের মতো নদীরও আইনি অধিকার রয়েছে এবং নদী দখল বা দূষণ করা এখন দণ্ডনীয় অপরাধ। আমাদের সবার উচিত নদীগুলো পরিষ্কার রাখা এবং বর্জ্য ফেলে পানি দূষিত না করা। নদী রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে তবেই আমরা একটি দূষণমুক্ত ও সমৃদ্ধ নদীমাতৃক দেশ গড়ে তুলতে পারব।
লেখক: শিক্ষার্থী



