বিনোদন যখন বিভীষিকা: ফুটবল উন্মাদনায় স্বজন হারানোর হাহাকার

দাউদুল ইসলাম নয়ন:
খেলাধুলা মূলত মানুষের চিত্তবিনোদনের একটি বড় মাধ্যম। আদিমকাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মানুষের অবসরের তালিকায় খেলাধুলা সবসময়ই শীর্ষস্থানে রয়েছে। একটি সফল খেলার পেছনে খেলোয়াড় ও দর্শক উভয় পক্ষই সমান গুরুত্বপূর্ণ। খেলোয়াড়ের আনন্দ আসে মাঠে সরাসরি অংশ নিয়ে কঠোর পরিশ্রমের পর জয়লাভ করা, নিজের দক্ষতা প্রমাণ করা এবং দলগত মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে, একজন দর্শকের আনন্দ আসে মাঠের টানটান উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তগুলো উপভোগ করা, প্রিয় দলের জন্য গলা ফাটানো এবং বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সঙ্গে বসে খেলা উদযাপনের মাঝে।
সমাজজীবনেও খেলাধুলার অবদান অনেক। এটি যেমন কাজের চাপ ও মানসিক ক্লান্তি দূর করে মনে সতেজতা আনে, তেমনি বিশ্বকাপ বা বড় কোনো টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্য গড়ে তোলে। তরুণ সমাজকে অপসংস্কৃতি বা মাদকের মতো ক্ষতিকর পথ থেকে দূরে রাখতেও এর বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের জয়ে পুরো জাতি এক হয়ে উৎসবের আমেজ গায়ে মাখে। এভাবে খেলাধুলা আমাদের একাকিত্ব দূর করে সমাজকে এক সুতোয় বাঁধে।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই এই সুস্থ বিনোদন কখনো কখনো মাত্রাতিরিক্ত উন্মাদনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত মারামারির রূপ নেয়। প্রিয় দলের প্রতি আবেগ যখন অন্ধত্বে রূপ নেয়, তখন কোনো মায়ের বুক খালি হয়, কোনো সন্তান তার বাবাকে হারায়। যে আনন্দ মন ভালো করার কথা ছিল, তা তখন এক নিমিষেই রূপ নেয় নির্মম এক বিভীষিকায়। স্বজন হারানোর পর সেই বিনোদন আর বিনোদন থাকে না।
আমাদের দেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব প্রায়ই বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চায়ের দোকান কিংবা পাড়ার মোড়ে সামান্য তর্কাতর্কির জেরে গত বিশ্বকাপের সময়ে লালমনিরহাট ও ভোলাসহ অন্তত ছয়টি জেলায় মারাত্মক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ঢাকার অদূরে সাভার এবং হবিগঞ্জের বাহুবলে হত্যাকাণ্ডের মতো দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে।
কেবল মারামারিই নয়, কে কত বড় পতাকা বানাতে পারে, সেই অসম প্রতিযোগিতা এবং অসাবধানতাও ডেকে আনে মৃত্যু। সম্প্রতি ২০২৬ সালের জুনে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ভাটবাউর এলাকায় ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক তরুণের অকাল মৃত্যু হয়েছে। এর আগে কাতার বিশ্বকাপের সময়ে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাদ থেকে পড়ে ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অন্তত ৭ জন ফুটবল সমর্থক প্রাণ হারিয়েছেন।
অবশ্য এই উন্মাদনা কখনো কখনো নিরীহ প্রতিযোগিতাতেও রূপ নেয়। যেমন সম্প্রতি ২০২৬ সালের জুনে নরসিংদীর পলাশে ব্রাজিলের সমর্থকেরা ১ হাজার ৩০০ ফুট দীর্ঘ একটি পতাকা বানানোর পর, তাদের টেক্কা দিতে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা ৩ হাজার ৩০০ ফুট দীর্ঘ বিশাল পতাকা নিয়ে শোভাযাত্রা বের করেন। কিন্তু সুস্থ প্রতিযোগিতা যখনই সহিংসতায় রূপ নেয়, তখনই তা বিপর্যয় ডেকে আনে।
উত্তেজনার এই নেতিবাচক প্রভাব শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল মাঠেও। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের একটি ম্যাচে ব্রাজিলের বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে দুই দেশের সমর্থকদের মারামারির জেরে আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা খেলা বন্ধ করে ড্রেসিংরুমে ফিরে গিয়েছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্বকাপ ম্যাচে নেদারল্যান্ডস ও আর্জেন্টিনা কিংবা উরুগুয়ে ও ঘানার মতো খেলায় খেলোয়াড়দের মধ্যকার হাতাহাতি শেষ পর্যন্ত ফিফার শাস্তিমূলক পদক্ষেপ পর্যন্ত গড়ায়।
খেলাধুলা একটি সুন্দর বিষয় এবং এটি কেবলই উপভোগ করার জন্য। প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন জানাতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করা, অন্যের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বড় বড় পতাকা টাঙাতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করা কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। সুস্থ সমাজ গঠনে আসুন আমরা খেলাকে খেলার জায়গায় রাখি এবং সুস্থ বিনোদন উপভোগ করি।



