বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ: জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এখনই পদক্ষেপের আহ্বান

প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার বৈশ্বিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ের মতো ক্রমবর্ধমান সংকটের মধ্যে দিবসটি এবার আরও বেশি গুরুত্ব বহন করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচি, আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে দিনটি। পরিবেশবিদদের মতে, বর্তমান সময়ে পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি শুধু প্রকৃতিকে বাঁচানোর নয়, বরং মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।
এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে দিবসটি পালন করা হয় এবং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে এটি জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃত।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দাবানল, ভয়াবহ বন্যা, খরা এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবীর বহু অঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তা, পানির সংকট এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও বহুগুণে বেড়ে যাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ভৌগোলিক অবস্থান ও ঘনবসতির কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের নেতিবাচক প্রভাব দেশের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে। নদীভাঙন, লবণাক্ততার বিস্তার, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং খরার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে।
জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে আরও কিছু গুরুতর পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্লাস্টিক বর্জ্য নদী, খাল ও জলাশয় দূষিত করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বনভূমি উজাড়ের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা ছাড়া উন্নয়ন কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তিনি আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, সবুজ শিল্পায়ন সম্প্রসারণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তার মতে, পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নও সম্ভব নয়।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ইতিহাসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন সুইডেনের স্টকহোম শহরে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর পরিবেশ সংরক্ষণকে বৈশ্বিক অগ্রাধিকার হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়। ওই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭৩ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হচ্ছে। এরপর থেকে পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব কেবল সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থার নয়; এতে প্রতিটি মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। একটি গাছ রোপণ, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ, বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ— এসব ছোট ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, বরং পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার এক বৈশ্বিক অঙ্গীকার। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের এই সময়ে প্রকৃতি রক্ষায় আজকের সচেতন পদক্ষেপই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ এবং টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করতে পারে।



