মদিনায় শুরু বহুল প্রতীক্ষিত খেজুরের মৌসুম, জমে উঠেছে বাজার-নিলাম কেন্দ্র

পবিত্র নগরী মদিনায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এ বছরের বহুল প্রতীক্ষিত খেজুরের মৌসুম। মৌসুমের প্রথম খেজুর বাগান থেকে সংগ্রহ করে বাজারে আনার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে এই বার্ষিক আয়োজন। ইতোমধ্যে মদিনার কেন্দ্রীয় খেজুর বাজার, নিলাম কেন্দ্র এবং আশপাশের কৃষি অঞ্চলগুলোতে ফিরে এসেছে কর্মচাঞ্চল্য। কৃষক, ব্যবসায়ী, পাইকারি ক্রেতা ও দেশ-বিদেশ থেকে আসা দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো অঞ্চলজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
মদিনা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেজুর উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর গ্রীষ্মের শুরুতেই এখানকার বাগানগুলোতে বিভিন্ন জাতের খেজুর পাকতে শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রামগুলো এবং ওয়াদি আল-সাফরা এলাকার বিস্তীর্ণ বাগান থেকে মৌসুমের প্রথম খেজুর বাজারে পৌঁছাতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে এবং বাজার আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
এবারের মৌসুমে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ‘রুথানা’ জাতের খেজুর। মদিনার স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসল্লি ও পর্যটকদের কাছেও এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। মাঝারি আকার, নরম গঠন, রসালো স্বাদ এবং পরিমিত মিষ্টতার কারণে প্রতি বছরই এই জাতের খেজুরের ব্যাপক চাহিদা থাকে। কৃষকদের ভাষ্য, জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে রুথানা পূর্ণমাত্রায় পাকতে শুরু করবে। তখন বাজারে এর সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং ক্রেতাদের জন্য আরও সহজলভ্য হবে।
মৌসুমের শুরুতে খেজুরের সরবরাহ সীমিত থাকায় দাম তুলনামূলক বেশি থাকে। কারণ, নতুন মৌসুমের প্রথম ফল সংগ্রহ করতে অনেক ক্রেতাই আগ্রহ দেখান। তবে জুলাই মাসে বিভিন্ন জাতের খেজুর একযোগে বাজারে আসতে শুরু করলে সরবরাহ বেড়ে যায় এবং স্বাভাবিকভাবেই দাম কমতে থাকে। ব্যবসায়ীদের ধারণা, ভরা মৌসুমে এক বাক্স রুথানা খেজুরের দাম নেমে প্রায় ১০ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত হতে পারে। তবে আগস্টে মৌসুম শেষের দিকে এগোলে সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে দাম আবারও বাড়তে পারে।
রুথানার পাশাপাশি মদিনার গ্রীষ্মকালীন খেজুরের মধ্যে লোনা ও রাবিয়া জাতও ব্যাপক জনপ্রিয়। মৌসুমের শুরুতেই এসব খেজুর বাজারে আসতে থাকে এবং স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে। এছাড়া বড় আকার, আকর্ষণীয় রঙ এবং মিষ্টি স্বাদের জন্য বার্নি খেজুরের আলাদা কদর রয়েছে। অন্যদিকে ধর্মীয় গুরুত্ব, ঐতিহ্য এবং উচ্চ বাজারমূল্যের কারণে আজওয়া খেজুর সব সময়ই বিশেষ অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ মদিনা সফরে এসে আজওয়া খেজুর সংগ্রহ করেন। এছাড়া সাফাওয়ি ও হালিয়াহ জাতের খেজুরও স্থানীয় বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা ধরে রেখেছে।
কৃষকরা জানান, উন্নত মান নিশ্চিত করতে প্রতিটি খেজুর সম্পূর্ণভাবে পাকার পরই সংগ্রহ করা হয়। অপরিপক্ব ফল বাজারে না এনে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গাছে রেখে দেওয়া হয়, যাতে স্বাদ, গুণগত মান এবং সংরক্ষণক্ষমতা বজায় থাকে। সংগ্রহের পর খেজুর সরাসরি স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে বাছাই, পরিষ্কার, প্যাকেটজাত এবং সংরক্ষণ করা হয়। এরপর সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিশ্বের বহু দেশেও রপ্তানি করা হয়।
মদিনার কেন্দ্রীয় খেজুর বাজার ও নিলাম কেন্দ্রগুলোতে ইতোমধ্যেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। ভোর থেকে কৃষকরা তাজা খেজুর নিয়ে বাজারে আসছেন, আর পাইকারি ব্যবসায়ীরা নিলামের মাধ্যমে এসব খেজুর কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাচ্ছেন। স্থানীয় অর্থনীতিতে এই মৌসুম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাজারো কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, ব্যবসায়ী ও প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত মানুষের আয়ের বড় একটি অংশ আসে এই মৌসুমকে ঘিরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছরের মতো এবারও জুন থেকে শুরু হওয়া খেজুরের মৌসুম আগস্ট মাসের শেষ পর্যন্ত চলবে। এই সময় মদিনার কৃষি, বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে ব্যাপক অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সৌদি খেজুর রপ্তানির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে খেজুরের এই মৌসুম শুধু একটি কৃষি আয়োজনই নয়, বরং মদিনার অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।



