রাজধানী পরিচ্ছন্নতায় নতুন উদ্যোগ: দিন-রাত দুই শিফটে কাজ করবেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা!

ঢাকাকে আরও পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করার লক্ষ্যে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে এখন থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দিন ও রাত—দুই শিফটে দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে বর্জ্য দ্রুত অপসারণ, আধুনিক যানবাহন সংগ্রহ, বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (১২ জুন) আয়োজিত এক সভায় ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, রাজধানীর উত্তর অংশকে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সিটি করপোরেশন বিভিন্ন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
প্রশাসক জানান, বর্তমানে ডিএনসিসির ১০টি অঞ্চলে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিবাকালীন ও রাত্রিকালীন—দুই শিফটে কাজ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর ফলে দিনের পাশাপাশি রাতেও নিয়মিতভাবে সড়ক ও জনসমাগমস্থল পরিষ্কার রাখা সম্ভব হবে এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্য জমে থাকার প্রবণতা কমে আসবে।
তিনি বলেন, নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে ডিএনসিসির ২৬টি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়া বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের প্রচলিত ভ্যান সার্ভিসকে সিটি করপোরেশনের সরাসরি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় আরও শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে পড়ে থাকা বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য ইতোমধ্যে বিশেষ কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) এবং মোবাইল টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত নজরদারি করবে এবং কোথাও বর্জ্যের স্তূপ তৈরি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রশাসক।
ডিএনসিসি প্রশাসক আরও বলেন, বর্তমানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত সব ধরনের যানবাহন ও যন্ত্রপাতির শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন কম্প্যাক্টর ট্রাক, হুক-লিফট ট্রাকসহ প্রয়োজনীয় যানবাহন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব আধুনিক প্রযুক্তির যানবাহন যুক্ত হলে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম আরও দ্রুত, কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব হবে।
বর্জ্য পৃথকীকরণ বা সোর্স সেগ্রিগেশন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ডিএনসিসির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৫০০টি প্লাস্টিক বিন বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫০টি সবুজ এবং ২৫০টি হলুদ রঙের বিন রয়েছে। পাশাপাশি ৫০ হাজার পিস পলিব্যাগও বিতরণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই কার্যক্রম আরও বিস্তৃত পরিসরে চালিয়ে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সভায় আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ নিয়েও কথা বলেন ডিএনসিসি প্রশাসক। তিনি জানান, ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ’ উৎপাদন প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানীতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন কঠিন বর্জ্য ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন বর্জ্যের পরিমাণ কমবে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসও তৈরি হবে।
নগর পরিচ্ছন্ন রাখতে নাগরিক সচেতনতার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ওয়ার্ডভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হবে। কারণ শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ নয়, নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণও একটি পরিচ্ছন্ন নগর গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নির্ধারিত স্থান ছাড়া কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে ময়লা-আবর্জনা ফেলা যাবে না। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলে এবং সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে সহযোগিতা করলে ‘ক্লিন ঢাকা, গ্রিন ঢাকা’ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
ডিএনসিসির এই উদ্যোগ রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দিন-রাত দুই শিফটে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত প্রয়াস ঢাকাকে আরও পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।



