লাঠি ও পাথর মেরে সরাতে হবে- নেতানিয়াহুকে নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিস্ফোরক মন্তব্যে তোলপাড় ইসরায়েল

ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মন্তব্য করে তিনি দাবি করেছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। আর যদি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে তাকে ‘লাঠি ও পাথর মেরে’ ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। বারাকের এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর দেশটির রাজনীতি, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
রোববার (১৪ জুন) ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এহুদ বারাক এসব মন্তব্য করেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই রাজনীতিক বলেন, তার আশঙ্কা হচ্ছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগামী নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে পারেন। বারাকের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা হতে পারে। খবর বার্তাসংস্থা আনাদোলু।
সাক্ষাৎকারে বারাক বলেন, যদি নেতানিয়াহু সত্যিই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেন, তাহলে জনগণের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না। এ সময় তিনি ‘লাঠি ও পাথর’ ব্যবহারের যে মন্তব্য করেন, সেটিই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক প্রতিবাদের আহ্বান হিসেবে দেখছেন, আবার সমালোচকরা বলছেন এটি সরাসরি সহিংসতাকে উসকে দেওয়ার শামিল।
বর্তমানে ৭৬ বছর বয়সী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ইসরায়েলের সরকার পরিচালনা করছেন। তার নেতৃত্বাধীন জোট সরকারকে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে কট্টরপন্থি সরকারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফিলিস্তিন ইস্যু, বিচার বিভাগ সংস্কার এবং আঞ্চলিক সামরিক নীতির কারণে তার সরকার দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
এহুদ বারাক দাবি করেন, নেতানিয়াহু আঞ্চলিক সংঘাতকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারেন। তার অভিযোগ, লেবাননে সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হতে পারে যাতে হিজবুল্লাহ কিংবা ইরান পাল্টা হামলা চালায়। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের অজুহাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বারাক আরও বলেন, নেতানিয়াহু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় রাখতে আগ্রহী। কারণ যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলাগুলোর বিচার আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। তার ভাষায়, রাজনৈতিক টিকে থাকার স্বার্থেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সংঘাতময় পরিস্থিতিকে দীর্ঘায়িত করতে চাইছেন।
শুধু তাই নয়, হামাসের সঙ্গে বন্দি বিনিময় চুক্তি নিয়েও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। বারাকের দাবি, সম্ভাব্য কিছু সমঝোতা চুক্তি বাস্তবায়নের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। একই ধরনের আচরণ লেবানন ইস্যুতেও দেখা গেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ইসরায়েলের সংসদ নেসেটের বর্তমান মেয়াদ চলতি বছরের অক্টোবরে শেষ হওয়ার কথা। সে অনুযায়ী সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবরে দেশটিতে নতুন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঠিক এমন একটি সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে এ ধরনের মন্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে বারাকের বক্তব্য প্রকাশের পরপরই নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির আইনপ্রণেতা এবং নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান বোয়াজ বিসমুথ এহুদ বারাকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্তের দাবি জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বারাক মূলত প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
বিসমুথ আরও কটাক্ষ করে বলেন, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো উচিত। আর যদি তিনি মানসিকভাবে সুস্থ প্রমাণিত হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বাকযুদ্ধ নয়; বরং এটি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ এবং চলমান যুদ্ধ-সংকটের মধ্যকার গভীর অস্থিরতারও প্রতিফলন। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক উত্তাপ যে আরও বাড়তে চলেছে, এহুদ বারাকের এই বক্তব্য সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।



