শিশুর হাতে বই, নয় শ্রমের বোঝা: আজ বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস

আজ ১২ জুন, বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বের কোটি কোটি শিশুকে শ্রমের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে তাদের জন্য শিক্ষা, নিরাপত্তা ও একটি সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করার আহ্বান নিয়ে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। প্রযুক্তি ও উন্নয়নের যুগে প্রবেশ করলেও এখনও বিশ্বের প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত। এদের মধ্যে কোটি কোটি শিশু এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এ বাস্তবতায় শিশুশ্রম নির্মূলে নতুন করে সচেতনতা সৃষ্টি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে বিশ্বব্যাপী।
জাতিসংঘ ঘোষিত এ বছরের বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- শিশুশ্রমকে লাল কার্ড দেখান, শিশুদের জন্য ন্যায্য সুযোগ, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজ। প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো, শিশুদের শ্রমে নয়, শিক্ষার আলোয় গড়ে তোলা এবং পরিবারগুলোর জন্য এমন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা, যাতে শিশুদের জীবিকা অর্জনের জন্য কাজে নামতে না হয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছে। এসব শিশু নির্মাণকাজ, ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনা, রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ কিংবা অন্যান্য বিপজ্জনক কাজে যুক্ত থাকায় তাদের জীবন ও স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সালে বিশ্বে শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ কোটি ৬০ লাখ। গত দুই দশকে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূল করতে বর্তমান অগ্রগতির হার যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রমের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র এখনো কৃষিখাত। আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, মোট শিশুশ্রমিকের প্রায় ৬১ শতাংশ কৃষিকাজে নিয়োজিত। ক্ষেত-খামার, পশুপালন, মৎস্য খামার ও বনজ কাজে বিপুল সংখ্যক শিশু কাজ করছে। এছাড়া প্রায় ২৭ শতাংশ শিশু বিভিন্ন সেবামূলক কাজে এবং ১৩ শতাংশ শিশু শিল্প খাতে শ্রম দিচ্ছে।
অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আফ্রিকা মহাদেশে শিশুশ্রমের হার সবচেয়ে বেশি। সেখানে প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। অন্যদিকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গত কয়েক বছরে শিশুশ্রমের হার কিছুটা কমেছে। তবে জনসংখ্যার বিশালতার কারণে এ অঞ্চলেও শিশুশ্রম এখনো একটি বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রমের অন্যতম উদ্বেগজনক ক্ষেত্র হলো শিশু গৃহকর্মী। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের অসংখ্য শিশু গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত থেকে নানাভাবে শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন অনুযায়ী গৃহকর্ম শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হলেও বাংলাদেশে এখনো এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (এএসডি)-এর ২০২৪ সালের ‘ঢাকা শহরের শিশু গৃহকর্মীদের পরিস্থিতি’ শীর্ষক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৩৫২ জন শিশু গৃহকর্মীর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের অনেকেই অতিরিক্ত কাজের চাপ, শারীরিক নির্যাতন, মানসিক হয়রানি, গালাগালি এমনকি যৌন সহিংসতারও শিকার হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অনেক শিশু গৃহকর্মীকে প্রতিদিন ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা কিংবা তারও বেশি সময় কাজ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের উপার্জিত মজুরিও সরাসরি তাদের হাতে দেওয়া হয় না; বরং পরিবারের সদস্য বা অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে শিশুরা নিজেদের শ্রমের যথাযথ মূল্য থেকেও বঞ্চিত হয়।
ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স রাইটস নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫ লাখ শিশু গৃহকর্মী প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষার বাইরে রয়েছে। সংগঠনটির মতে, গৃহকর্মকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করার কারণে এসব শিশু ন্যূনতম নিরাপত্তা ও অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শিশু গৃহশ্রমকে শুধু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং এটি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ শিশুদের শ্রমে ঠেলে দেওয়ার প্রধান কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করলেই শিশুশ্রম নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বাড়ানো এবং শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাও প্রয়োজন।
বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে সংশ্লিষ্টদের একটাই আহ্বান- প্রতিটি শিশুর হাতে বই তুলে দিতে হবে, শ্রমের বোঝা নয়। কারণ একটি শিশু যখন স্কুলের বেঞ্চ ছেড়ে কর্মস্থলে যেতে বাধ্য হয়, তখন শুধু তার শৈশবই হারিয়ে যায় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি দেশের ভবিষ্যৎ, উন্নয়ন এবং মানবিক মূল্যবোধও। শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করাই হতে পারে একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।



